আমরা এমন অনেক কিছু সত্য বলে মেনে নিই যা বারবার শুনলে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। ভেবে দেখুন তো, আপনার সঙ্গে কখনও এমনকিছু ঘটেছে কীনা। আপনি খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে চুলের নতুন স্টাইল করলেন। আপনার নিজেকে দেখতে দারুণ লাগছে। পরের দিন প্রিয় পোশাক পরে কাজে বের হলেন, নিজেকে চমৎকার মনে হচ্ছে। আপনি ভাবছেন, "দারুণ হয়েছে! এই সিদ্ধান্তটা ভালো ছিল।" অফিসের লিফটে ঢুকতেই কেউ আপনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, "ওহো, আপনি চুল কেটে ফেললেন? কেন করলেন এটা?" আপনার হাত চুলে চলে গেল, আর আপনার মনে হওতে লাগল যে একটা টুপি পরে নিতে পারলে ভালো হতো। আপনার ভীষণ খারাপ লাগতে লাগলো। কেন আপনি চুল কাটালেন?
আত্মসম্মান অনেক মহিলার জন্য একটি সমস্যা। আজকাল দারুণ চিকন মডেল আর সুপারমমের প্রত্যাশার যুগে এটি আশ্চর্যের কিছু নয়। মজার ব্যাপার হল অন্যের মতামত আমরা বিস্ময়কর দ্রুততার সাথে মেনে নিই এবং নিজের প্রতি বিশ্বাসের অভাব আশ্চর্যজনক গভীর হয়ে থাকে। আমার ক্ষেত্রে, এটি স্কুলে শুরু হয়েছিল, যেখানে চার-পাঁচজন ছেলে প্রতিদিন আমাকে বলে যেত যে আমি বোকা আর কুৎসিত। আমি তাদের কথা বিশ্বাস করতাম। আমার বাবা-মা পরস্পরকে ভালোবাসতেন, আমাকে ভালোবাসতেন এবং সবসময় উৎসাহ দিতেন। আমার গ্রেড ছিল দারুণ, এবং তৃতীয় শ্রেণি থেকে একটি ভালো বন্ধু ছিল। তবু, যখন প্রতিদিন আমাকে বলা হতো যে আমার কোনো মূল্য নেই, আর আমি তা পুরোপুরি বিশ্বাস করতাম। আমার আত্মসম্মান একেবারে তলানিতে পৌঁছেছিল, যা প্রায় আমাকে শেষ করে দিচ্ছিল।
আত্মসম্মান কী?
আত্মসম্মানের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা কঠিন। এটি নিছক নিজেকে ভালোবাসা, সাফল্যে গর্ব করা, বা আয়নার সামনে নিজেকে দেখে খুশি হওয়ার চেয়েও গভীর বিষয়। এটি আসলে নিজেকে মূল্যবান হিসেবে দেখার ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ড. জন নেমিয়াহ তার বই *Foundations of Psychopathology-তে আত্মসম্মানকে সংজ্ঞায়িত করেছেন "নিজেকে মূল্যবান হিসেবে দেখার ক্ষমতা" হিসেবে।
আমরা প্রায়ই এই সমীকরণ উল্টোভাবে দেখি। আমরা মনে করি, আমাদের চেহারা আমাদের আত্মসম্মানের মাত্রা নির্ধারণ করে। বাস্তবে, এটি আমাদের আত্মসম্মান — অর্থাৎ নিজেকে মূল্যবান হিসেবে দেখার ক্ষমতা — যা আয়নার সামনে আমাদের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করে।
হীনম্মন্যতার প্রভাব
আমার আত্মবিশ্বাস কমে গিয়ে আত্মসম্মান মুছে যেতে শুরু করেছিল। আমি ক্লাসে, গ্রুপে, এবং করিডোরে কারোর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। দুপুরের খাবারের সময় ভয় পেতাম, ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরে পা রাখতাম না, এবং ক্লাসের প্রেজেন্টেশনের চিন্তাতেই অসুস্থ হয়ে যেতাম। আমি নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়েছিলাম এবং হাসা বন্ধ করে দিয়েছিলাম।
আমি বিশ্বাস করতাম যে আমি মূল্যহীন। আমার গ্রেড ভালো হওয়া সত্ত্বেও, প্রতিটি টেস্ট এবং অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে দুশ্চিন্তা করতাম। পুরো জীবনটাই যেন অদৃশ্য থাকার চেষ্টায় সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি মনে করতাম, যদি সবাই আমাকে ভুলে যায়, তাহলে আমি আঘাত পাব না। এই পরিস্থিতি চলতেই থাকল এবং আমই বুঝতে পারলাম যে আমাকে এর মধ্য থেকে বেরোতে হবে। আমি পলায়নপর জীবন যাপনের কথা মোটেও ভাবছিলাম না। আমি বরং আমার জীবনটা শেষ করে দেয়ার কথা ভাবছিলাম। আমার মত এই অভিজ্ঞতা আরও অনেকেরই হয়েছে।
আপনার মনেও কি আত্মহত্যার চিন্তা আসে? তাহলে স্কটের গল্পটি পড়ুন।
হীনম্মন্যতা এবং বিষণ্নতা
হীনম্মন্যতা সবসময় বিষণ্নতার কারণ হয় না, তবে এ দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিষণ্নতার সংজ্ঞায় হীনম্মন্যতার কথা উল্লেখ করেছে।
হীনম্মন্যতা আমাদের নিজেদের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত করে। আমরা অনেকসময় ভাবি যে "যদি আমি আরেকটু সুন্দর হতাম, যদি আমি খেলাধুলায় ভালো হতাম, যদি আমি মজার বা জনপ্রিয় হতাম"। প্রশংসা পেলেও আমাদের ভেতর থেকে কেউ যেন সেই প্রশংসাগুলো নাকচ করে দেয়। জুলিয়া রবার্টস তাঁর '"প্রিটি উম্যান'' নামের একটি মুভিতে বলেছিলেন, "খারাপ কথা বিশ্বাস করা সহজ।"
বিষণ্ণতার লক্ষণ অনেক সময় অনেক গভীরে মিশে থাকে, আর তাই, অনেক সময় এগুলোকে আমরা ছোটখাট, অগুরুত্বপূর্ণ বা হরমঞ্জনিত বলে উড়িয়ে দিই। আমরা ভাবি যে বড় হয়ে ওঠার একটা অংশ এটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO-এর মতে, ২৫ ভাগেরও কমসংখ্যক মানুষ বিষণ্ণতার যথাযথ চিকিৎসা/তদারকি পায়গ বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে এটি নজরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আত্মহত্যাপ্রবণতা তাদের মৃত্যুর তিনটি প্রধান কারণের একটি। এমনকি প্রাপ্তবয়স্কদের কর্মদক্ষতা, সঙ্গদানে অনিচ্ছা, এবং বাবা-মা হিসেবে তাদের দক্ষতার উপরেও হীনম্মন্যতার প্রভাব পড়ে । এ ধরনের চিন্তাগুলো আমাদের সবকিছু গ্রাস করে ফেলে।
সুস্থ হওয়া
একাদশ শ্রেণির মাঝামাঝি সময়ে পৌঁছেও আমার অবস্থার কোন উন্নতি হয় নি। তখন আমি অন্য একটি স্কুলে চলে যাই। সেখানে অপমান বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু নিজের মুখোমুখি তো হতেই হচ্ছিল। স্থান পরিবর্তন করে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। আত্মমর্যাদাবোধ পুনরুদ্ধার করতে হলে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।
আমি নিজেকে পছন্দ করা শুরু করার পর থেকেই বিশ্বটা কম ভীতিকর মনে হতে থাকে। আত্মসম্মান নিয়ে বই পড়া, কাউন্সেলরের কাছে যাওয়া বা কোনো কনফারেন্সে যোগ দিলে অনেকটা সহায়তা পাওয়া যায়। আমি এগুলো করেছিলাম। সেখান থেকেই আমার সুস্থ হওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল। শেষমেশ আমি আবার আশা খুঁজে পেয়েছিলাম। আর এখন আমি ভাবছি, আবার চুল কাটানোর জন্য পার্লারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নেব!
এই প্রবন্ধটির লেখক: Lynette Hoy, NCC, LCPC
ছবি স্বত্ব: Caique Silva